মনে আছে ইনাকে? ইনার জীবন সংগ্রামের কথা জানলে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে।

কালী পূজার সময় আমরা অনেকেই আতশবাজি নিয়ে মেতে উঠি আনন্দে। তবে অনেকেই খেয়াল করি না হয়ত, বেশিরভাগ আতশবাজির গায়ে লেখা থাকে বুড়িমার আতশবাজি। অনেক আতশবাজির প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে এবং একজন বয়স্ক মহিলার ছবি দেওয়া থাকে। কিন্তু কে এই ভদ্রমহিলা, কি তার অস্তিত্ব, কিবা তার পরিচয়, চলুন বিস্তারিত ভাবে জেনে নেওয়া যাক।

সময়টা দেশভাগের সময়। ১৯৪৮ সাল। রোগ ধরতে না পারার জন্য বাঁচানো যায়নি তার স্বামীকে। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে অন্নপূর্ণা গঙ্গারামপুরে পাড়ি দিলেন। সেখানে একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেন তিনি। গঙ্গারামপুর বাজারে একজনের কাছ থেকে শিখলেন বিড়ি বাধা, ছেলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বিড়ি বেঁধে কোনরকমে সংসার চালাতেন তিনি। এইভাবে আস্তে আস্তে বাড়ি, সন্তানদের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে সবকিছুই হল আস্তে আস্তে। বেলুড়ে ৯০০ টাকার একটি দোকান কিনে নিলেন তিনি। আস্তে আস্তে গঙ্গারামপুর থেকে চলে এলেন বেলুড়।

ছেলেকে দোকানে বসিয়ে ভেবে ফেললেন এইবার বাজার ধরতে হবে। কিন্তু বাজার যে ধরবেন, কিভাবে ধরবেন? কোন ব্যবসায় লাভ হবে? কিছুই চিন্তা করতে পারছেন না তিনি। প্রথমে মূর্তি বানানোর কাজ শুরু করলেন তিনি। সরস্বতী পূজার সময় একরাশ মূর্তি নিয়ে বসলেন পসরা সাজিয়ে, তারপর দোল পূর্ণিমার সময় রঙের পসরা নিয়ে বসলেন, সবকিছুই চলল রমরমিয়ে।

একদিন তার দোকানে কিছু কচিকাঁচা এসে হাজির হলো। তারা বলল, বুড়িমা লজেন্স দাও। সঙ্গে সঙ্গে অন্নপূর্ণা দেবীর নাম পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে হল বুড়িমা। লোকের মুখে মুখে বুড়িমা নামটা ছড়িয়ে পড়ল। সময়ের সাথে সাথে চলে এলো কালীপুজো। বুড়িমা র ইচ্ছে দোকানে বাজি তুলবেন। হাতে টাকা নেই তাই টাকা ধার করে বাজি কিনলেন। কিন্তু তার পরেই ঘটল দুর্ঘটনা। পুলিশ এসে সমস্ত দোকান ভেঙে দিয়ে চলে গেল। বলে গেল বাজি বিক্রির লাইসেন্স না থাকলে বাজি বিক্রি করা যাবে না।

কিন্তু বাজি যে বিক্রি করতে হবে তাকে। তাই বাঁকুড়ার আকবর আলীর কাছে শিখতে গেলেন বাজি তৈরি। প্রথমবারেই করলেন বাজিমাত। বিখ্যাত হয়ে গেল বুড়িমার চকলেট বোম। সেই থেকে যাত্রা শুরু। বাজি কারখানার জন্য তিনি জায়গা কিনলেন। একসময় যার মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তিনি পঞ্চাশটি পরিবারকে বাড়ি বানিয়ে দিলেন।

একটা কথা সবসময় বলতেন, ব্যবসা অতি তুচ্ছ জিনিস। মানুষকে ভালবাসতে হবে আগে। সে বিখ্যাত মানুষটি যেদিন চোখের জলে সকলকে ভাসিয়ে চলে গেলেন, সেদিন কিছু মানুষ বুড়িমার চকলেট বোম ফাটিয়ে ছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য করে যখন বলা হলো এই সময় চ্যাংরামো হচ্ছে? তখন তারা বললেন, চ্যাংরামো নয় এটা জয়ের ধ্বনি। যে চকলেট বোম বানিয়ে বুড়িমা সকলের মন জয় করে নিয়েছিলেন, তাকে এই ভাবে শ্রদ্ধা জানানো হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button